হজ প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ঘোষণা
করেছেন, “وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا”“মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরের হজ করা তার ওপর অবশ্য কর্তব্য।”
(সূরা আলি ইমরান: ৯৭)। হজ শুধু মক্কায় যাওয়া বা নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার নাম নয়।
প্রতিটি আমলের নির্ধারিত হুকুম ও নিয়ম রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজে বলেছেন—
“خُذُوا عَنِّي مَنَاسِكَكُمْ”“তোমরা আমার কাছ থেকে হজের নিয়মকানুন শিখে নাও।” ইসলামিক ফিকহ ও
ফতোয়া অনুযায়ী, হজের পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত: ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সাধারণভাবে হজের ৩টি প্রধান ফরজ উল্লেখ করা হয়—ইহরাম, আরাফাতে অবস্থান এবং তাওয়াফে
জিয়ারত। এর পাশাপাশি হজ পালনে ধারাবাহিক বেশ কয়েকটি ওয়াজিব ও সুন্নত আমল রয়েছে। ফরজ শুধু দম
দিয়ে পূরণ করা যায় না, আর কোনো ওয়াজিব বিনা ওজরে বাদ পড়লে পরিস্থিতি অনুযায়ী দম প্রয়োজন হতে পারে।
এই লেখায় হজের ফরজ, গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ও সুন্নতগুলো আলাদা করে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে কোন আমল
বাদ পড়লে কী করণীয় এবং যেসব মাসআলায় মাযহাবভেদ রয়েছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা।
হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের একটি। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ পালন
করা ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন—“মানুষের মধ্যে যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ ঘরের হজ করা
তার ওপর অবশ্য কর্তব্য।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৯৭)
হজের ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ
শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক প্রতিটি সুস্থ মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর জীবনে একবার হজ করা
ফরজ।
মুসলিম হওয়া: অমুসলিমদের ওপর হজ ফরজ নয়।
প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) হওয়া: অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ওপর হজ ফরজ নয়।
বিবেকবান (সুস্থ মস্তিষ্ক) হওয়া: পাগল বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ নয়।
স্বাধীন হওয়া: ক্রীতদাস বা দাসদের ওপর হজ ফরজ নয়।
শারীরিক সামর্থ্য: যাতায়াত ও হজ পালনের মতো শারীরিক সুস্থতা ও সক্ষমতা থাকা।
আর্থিক সামর্থ্য: যাওয়া-আসার খরচ, মক্কায় থাকা-খাওয়ার খরচ এবং পিছে পরিবারের ভরণপোষণ দেয়ার
সামর্থ্য থাকা। এমনকি কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করার পর হজের খরচ থাকতে হবে।
পথের নিরাপত্তা: যাতায়াতের পথ নিরাপদ হওয়া।
নারীদের জন্য মাহরাম: হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নারীর হজের ক্ষেত্রে নিরাপদ সফরসঙ্গী বা মাহরাম (যাদের সঙ্গে
বিবাহ নিষিদ্ধ) থাকা শর্ত।
এক নজরে হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত
বিষয়
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী প্রচলিত হিসাব
বাদ পড়লে কী হয়
ফরজ
৩টি
দম দিয়ে পূরণ হয় না; ফরজ আদায় অপরিহার্য
ওয়াজিব
৭টি প্রধান ওয়াজিব
বিনা ওজরে বাদ পড়লে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দম প্রয়োজন হতে পারে
সুন্নত
একক নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই
বাদ পড়লে সাধারণভাবে দম লাগে না
হজের ফরজ কয়টি ও কী কী?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী হজের প্রধান ফরজ ৩টি—ইহরাম গ্রহণ, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান এবং তাওয়াফে জিয়ারত বা তাওয়াফে ইফাদা। এই তিনটির গুরুত্ব অন্য আমলের চেয়ে বেশি, কারণ কোনো ফরজ বাদ পড়লে শুধু দম দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় না।
১. হজের নিয়তে ইহরাম গ্রহণ
ইহরাম মানে শুধু পুরুষের দুই টুকরা সাদা কাপড় নয়। হজের নিয়ত করে ইহরামের নির্ধারিত বিধিনিষেধের মধ্যে প্রবেশ
করাই এর মূল অর্থ। মীকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম গ্রহণ করতে হয়। পুরুষরা ইজার ও রিদা পরেন। নারীরা শরিয়তসম্মত
স্বাভাবিক পোশাকে ইহরাম গ্রহণ করতে পারেন। হজের নিয়ত করার পর তালবিয়া পাঠ করা হয়—
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। সকল প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনারই।
আপনার কোনো শরিক নেই।
ইহরাম ছাড়া হজ শুরু হয় না। আবার ইহরাম গ্রহণ এবং মীকাত অতিক্রমের আগেই ইহরামে প্রবেশ—দুটি বিষয় আলাদাভাবে বুঝতে
হবে।
২. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান
আরাফাতে অবস্থান বা উকুফে আরাফা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন। ৯ জিলহজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আরাফাতের
সীমানায় অবস্থান করতে হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“الْحَجُّ عَرَفَةُ”
অর্থ: “হজ হলো আরাফাত।” (জামে তিরমিজি, হাদিস ৮৮৯)
এই হাদিস থেকেই আরাফাতের গুরুত্ব বোঝা যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আরাফাতে অবস্থান না হলে শুধু দম দিয়ে সেই
ঘাটতি পূরণ করা যায় না।
দিনের বেলায় আরাফাতে পৌঁছালে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে থাকা হানাফি ফিকহে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব বিধানের
অন্তর্ভুক্ত।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত বা তাওয়াফে ইফাদা
আরাফাতের পর কাবা শরিফের যে ফরজ তাওয়াফ করা হয়, তাকে তাওয়াফে জিয়ারত বা তাওয়াফে ইফাদা বলা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ”
অর্থ: “এবং তারা যেন প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে।” (সূরা আল-হজ, আয়াত ২৯)
তাওয়াফে জিয়ারত হজের মূল রুকন। এটি বাদ দিয়ে শুধু দম বা কোরবানি করলে এই ফরজ আদায় হয়ে যায় না।
হজের ওয়াজিব কয়টি ও কী কী?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী হজে বেশ কয়েকটি ওয়াজিব আমল রয়েছে। এখানে হজের
৭টি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোনো ওয়াজিব বিনা ওজরে বাদ পড়লে হজ সাধারণত
বাতিল হয় না, তবে আমল ও পরিস্থিতি অনুযায়ী দম প্রয়োজন হতে পারে।
১. মীকাত অতিক্রমের আগে ইহরাম গ্রহণ করা
হজ বা ওমরাহর নিয়তকারী ব্যক্তিকে নিজের নির্ধারিত মীকাত অতিক্রমের আগেই ইহরাম গ্রহণ করতে হয়। রাসূলুল্লাহ
(সা.) বিভিন্ন দিক থেকে মক্কায় আগত হাজীদের জন্য আলাদা মীকাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং হজ বা ওমরাহর উদ্দেশ্যে
সেসব পথ দিয়ে আগত ব্যক্তিদের সেখান থেকেই ইহরাম গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—
অর্থ: নবী (সা.) মদিনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা, শামবাসীদের জন্য জুহফা, নজদবাসীদের জন্য কারনুল মানাযিল
এবং ইয়েমেনবাসীদের জন্য ইয়ালামলামকে মীকাত নির্ধারণ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫২৪)
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী হজ বা ওমরাহর নিয়ত থাকা অবস্থায় ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করা ওয়াজিবের পরিপন্থী।
এমতাবস্থায় সম্ভব হলে মীকাতে ফিরে গিয়ে ইহরাম গ্রহণ করতে হয়; ফিরে না গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দমের বিধান আসতে
পারে।
২. মুযদালিফায় অবস্থান
৯ জিলহজ সূর্যাস্তের পর আরাফাত থেকে মুযদালিফায় যেতে হয়। সেখানে মাগরিব ও এশার সালাত আদায়, নির্ধারিত সময়
অবস্থান এবং ফজরের পর আল্লাহর জিকির ও দোয়া করা হজের গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন—
অর্থ: “তোমরা যখন আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরুল হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণ করো।”
(সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৯৮)
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে মুযদালিফায় অবস্থান করা হজের ওয়াজিব আমলের অন্তর্ভুক্ত।
৩. সাফা-মারওয়ার সাঈ করা
সাফা থেকে মারওয়া এবং মারওয়া থেকে সাফা—এভাবে মোট সাত পর্ব সম্পন্ন করাকে সাঈ বলা হয়। সাঈ সাফা থেকে শুরু হয়ে
মারওয়ায় শেষ হয়। পুরুষরা সবুজ চিহ্নিত অংশে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছুটা দ্রুত চলেন, আর নারীরা স্বাভাবিক গতিতে
হাঁটেন। সাঈর হুকুমে মাযহাবভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহ এটিকে হজের রুকন হিসেবে গণ্য করেন।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে সাঈ ওয়াজিব। তাই হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এটি হজের ওয়াজিব আমলের তালিকায় রাখা
হয়।
৪. জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা
হজের নির্ধারিত দিনগুলোতে জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ বা রমি করা ওয়াজিব। ১০ জিলহজ শুধু বড় জামারা বা
জামারাতুল আকাবায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়। ১১ ও ১২ জিলহজ ছোট, মধ্যম ও বড়—তিনটি জামারায় সাতটি করে মোট ২১টি
কঙ্কর নিক্ষেপ করতে হয়। যারা ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মিনায় থাকেন, তারা সেদিনও তিন জামারায় রমি করবেন। প্রতিটি কঙ্কর
নিক্ষেপের সময় “আল্লাহু আকবার” বলা হয়। রমির সময় নির্ধারিত নিয়ম ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা জরুরি।
৫. তামাত্তু ও কিরান হজে হাদি বা দমে শোকর আদায় করা
হজে তামাত্তু ও হজে কিরান পালনকারীর জন্য হাদি বা দমে শোকর আদায় করা ওয়াজিব। এটি হজের কোনো ভুলের
ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া দম নয়; বরং একই সফরে ওমরাহ ও হজ আদায়ের শুকরিয়া হিসেবে এই হাদি দেওয়া হয়। হজে ইফরাদ
পালনকারীর জন্য একই কারণে হাদি ওয়াজিব নয়। তাই “প্রত্যেক হাজীর জন্য কোরবানি ওয়াজিব”—এভাবে বলা সঠিক নয়। কোন
ধরনের হজ পালন করা হচ্ছে, তার ওপর এই বিধান নির্ভর করে।
৬. মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করা
রমি ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোরবানি সম্পন্ন করার পর পুরুষরা মাথা মুণ্ডন বা চুল ছোট করেন। মাথা সম্পূর্ণ মুণ্ডন
করাকে হলক এবং চুল ছোট করাকে কসর বলা হয়। মাথা মুণ্ডন করা অধিক ফজিলতপূর্ণ। নারীরা মাথা মুণ্ডন
করবেন না। তারা চুলের ডগা থেকে প্রয়োজনীয় অল্প অংশ কাটবেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) মাথা মুণ্ডনকারীদের জন্য বিশেষভাবে
দোয়া করেছেন। হানাফি ফিকহে হলক বা কসর হজের ওয়াজিব আমলের অন্তর্ভুক্ত।
৭. বিদায়ী তাওয়াফ করা
মীকাতের বাইরের অঞ্চল থেকে আসা হাজীদের জন্য মক্কা ত্যাগের আগে তাওয়াফুল ওয়া'দা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা
ওয়াজিব। হজের অন্যান্য কাজ শেষ করে বাইতুল্লাহর তাওয়াফকে মক্কায় শেষ গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে রাখা হয়। ইবনে
আব্বাস (রা.) বলেন—
অর্থ: “মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন বাইতুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎই হয় তাদের শেষ কাজ। তবে ঋতুমতী নারীর
জন্য এ বিধানে ছাড় দেওয়া হয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ১৭৫৫)
তাই সাধারণ অবস্থায় বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব হলেও ঋতুমতী নারীর ক্ষেত্রে এটি আদায় করতে না পারলে শরিয়তে ছাড়
রয়েছে।
নোট: হজের ওয়াজিব গণনার পদ্ধতিতে ফিকহি গ্রন্থে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এখানে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী
বহুল আলোচিত ৭টি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব তুলে ধরা হয়েছে।
হজের সুন্নত কয়টি ও কী কী?
হজের সুন্নতের নির্দিষ্ট একটি সর্বসম্মত সংখ্যা নেই। কারণ কোনো কোনো আমলকে একসঙ্গে একটি সুন্নত হিসেবে ধরা হয়,
আবার বিস্তারিত আলোচনায় একই আমলের কয়েকটি অংশ আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়। তবে হজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতগুলোর মধ্যে
নিচের আমলগুলো বিশেষভাবে পরিচিত।
১. ইহরাম বাঁধার আগে গোসল করা।
ইহরামে প্রবেশের আগে গোসল করে শরীর পরিষ্কার করা সুন্নত। নখ কাটা, গোঁফ ছাঁটা বা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত
পরিচ্ছন্নতার কাজ থাকলে সেগুলোও ইহরাম গ্রহণের আগেই শেষ করে নেওয়া ভালো। এতে ইহরাম অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা
এড়ানো যায়।
২. পুরুষের ইজার ও রিদা পরা (সেলাইবিহীন সাদা চাদর ও লুঙ্গি)
পুরুষ হাজীরা ইহরামের সময় দুই খণ্ড পরিষ্কার কাপড় পরেন—নিচের অংশকে ইজার এবং ওপরের অংশকে রিদা বলা
হয়। সাধারণত সাদা কাপড় ব্যবহার করা হয়। পোশাক যেন পরিষ্কার, আরামদায়ক এবং ইহরামের বিধান অনুযায়ী হয়, সেদিকে
খেয়াল রাখা জরুরি।
৩. পুরুষের উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ
ইহরাম গ্রহণের পর পুরুষদের জন্য স্পষ্ট ও শ্রুতিযোগ্য কণ্ঠে বেশি বেশি তালবিয়া পাঠ করা সুন্নত। যাত্রাপথে,
অবস্থান পরিবর্তনের সময় এবং সুযোগ পেলেই তালবিয়া পড়া যায়। নারীরা অন্যদের বিরক্ত না করে নিচু স্বরে তালবিয়া
পড়বেন।
৪. তাওয়াফে কুদুম করা
মক্কার বাইরের ইফরাদ ও কিরান হজকারী মক্কায় পৌঁছে কাবা শরিফের যে আগমনী তাওয়াফ করেন, সেটি তাওয়াফে কুদুম।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী এটি সুন্নত। হজে তামাত্তু পালনকারীর জন্য আলাদা তাওয়াফে কুদুম নেই, কারণ তিনি মক্কায় এসে
প্রথমে ওমরাহর তাওয়াফ করেন।
৫. প্রযোজ্য তাওয়াফে রমল করা
যে তাওয়াফের পর সাঈ করা হবে, সেখানে প্রযোজ্য অবস্থায় পুরুষরা প্রথম তিন চক্করে স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা দ্রুত
ও দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটেন। এটিকে রমল বলা হয়। বাকি চার চক্কর স্বাভাবিক গতিতে সম্পন্ন করা হয়। নারীদের জন্য
রমল নেই।
৬. ৮ জিলহজ মিনায় অবস্থান
৮ জিলহজ মিনায় গিয়ে যোহর, আসর, মাগরিব, এশা এবং পরদিন ফজরের সালাত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করা রাসূলুল্লাহ
(সা.)-এর হজের অনুসৃত পদ্ধতি। এই সময় অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় না দিয়ে তালবিয়া, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায়
মনোযোগ দেওয়া উত্তম।
৭. মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশে যাত্রা
৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফাতের উদ্দেশে যাত্রা করা হজের সুন্নতি ধারাবাহিকতার অংশ। পথে তালবিয়া,
তাকবির ও জিকির করা যায়। আরাফাতে পৌঁছে হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল—উকুফে আরাফার জন্য প্রস্তুত হতে হয়।
৮. আরাফাতে অবস্থানের আগে গোসল করা
আরাফাতে উকুফের আগে সুযোগ থাকলে গোসল করা সুন্নত। বিশেষ করে গরম আবহাওয়া ও দীর্ঘ যাত্রার পর এটি শরীরকে সতেজ
রাখতেও সহায়তা করে। তবে অসুস্থতা, ভিড় বা অন্য কোনো বাস্তব সমস্যার কারণে গোসল সম্ভব না হলে এতে হজের কোনো ক্ষতি
হয় না।
৯. সূর্যাস্তের পর আরাফাত থেকে মুযদালিফায় যাওয়া
৯ জিলহজ আরাফাতে অবস্থান করলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আরাফাত থেকে
শান্তভাবে মুযদালিফার উদ্দেশে রওনা হওয়া রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত পদ্ধতি। তাড়াহুড়া বা ভিড়ের মধ্যে অন্যকে
কষ্ট না দিয়ে নিজের দল ও গাইডের নির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো।
১০. ছোট ও মধ্যম জামারার পর দোয়া করা
১১ ও ১২ জিলহজ ছোট ও মধ্যম জামারায় রমি শেষ করে কিছুটা সরে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা সুন্নত। এই সময় আল্লাহর কাছে
নিজের ও পরিবারের জন্য কল্যাণ এবং ক্ষমা চাইতে পারেন। তবে বড় জামারা বা জামারাতুল আকাবায় রমির পর সেখানে দাঁড়িয়ে
একইভাবে দীর্ঘ দোয়া করা হয় না।
ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতের মূল পার্থক্য কী?
ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত—তিনটিই হজের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ আমল। কোনো আমল বাদ পড়লে হজের ওপর তার প্রভাবও আলাদা
হয়। নিচের টেবিলে পার্থক্যগুলো সহজভাবে দেখানো হলো।
বিষয়
ফরজ (Fard)
ওয়াজিব (Wajib)
সুন্নত (Sunnah)
মূল অর্থ
হজের অপরিহার্য ও মৌলিক আমল
পালন করা আবশ্যক, তবে ফরজের নিচের স্তর
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত পদ্ধতি ও আমল
হজে গুরুত্ব
হজ সহিহ হওয়ার জন্য ফরজ আদায় অপরিহার্য
সঠিকভাবে হজ সম্পন্ন করতে ওয়াজিব পালন জরুরি
হজকে সুন্নাহ অনুযায়ী সুন্দরভাবে পালন করতে সহায়তা করে
বাদ পড়লে
শুধু দম দিয়ে ঘাটতি পূরণ হয় না; ফরজ আদায় করতে হয়
বিনা ওজরে বাদ পড়লে পরিস্থিতি অনুযায়ী দম দিতে হতে পারে
সাধারণভাবে দম দিতে হয় না
ভুলে বাদ গেলে
দ্রুত শরিয়াহসম্মত করণীয় জেনে নিতে হবে
ভুলের ধরন অনুযায়ী দম বা অন্য করণীয় হতে পারে
সাধারণভাবে হজ নষ্ট হয় না এবং দমও লাগে না
হজে উদাহরণ
ইহরাম, আরাফাতে অবস্থান, তাওয়াফে জিয়ারত
সাঈ, মুযদালিফায় অবস্থান, জামারায় রমি, হলক বা কসর
ইহরামের আগে গোসল, তালবিয়া, তাওয়াফে কুদুম, মিনায় অবস্থান
করণীয়
কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না
যথাসময়ে ও সঠিকভাবে আদায় করার চেষ্টা করতে হবে
সামর্থ্য অনুযায়ী অনুসরণ করা উত্তম
আপনার হজের প্রস্তুতি শুরু করুন
হজের প্রস্তুতির পাশাপাশি ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত আমলগুলো সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। প্রয়োজনীয় মাসআলা ও
হজের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
হজের কিছু মাসআলায় মাযহাবভেদ রয়েছে। তাই একই বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেখলে প্রথমেই বিভ্রান্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই।
যেমন, সাঈ অধিকাংশ ফকিহের মতে রুকন বা ফরজ হলেও ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ওয়াজিব। একইভাবে মিনায়
রাতযাপনসহ আরও কিছু আমলের হুকুমেও মাযহাবভেদ দেখা যায়। তাই হজের আগে নিজের অনুসৃত মাযহাব অনুযায়ী মাসআলা শিখুন।
কোনো বিষয়ে নিশ্চিত না হলে অভিজ্ঞ আলেম বা শরিয়াহ গাইডের কাছ থেকে জেনে নিন।
নিজের অনুসৃত মাযহাব অনুযায়ী মাসআলা শিখুন।
একই বিষয়ে ভিন্ন মত দেখলে বিভ্রান্ত হবেন না।
সাঈসহ কিছু আমলে মাযহাবভেদ রয়েছে।
মিনায় অবস্থানের কিছু বিধানেও মতপার্থক্য আছে।
সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নিন।
শরিয়াহ গাইডের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
অনলাইনের সব তথ্য যাচাই ছাড়া অনুসরণ করবেন না।
সাইফ হজ্জ ও উমরাহ ট্রাভেলস-এর সঙ্গে সঠিক মাসআলা জেনে হজের প্রস্তুতি নিন
হজের প্রস্তুতি শুধু ফ্লাইট, হোটেল বা প্রয়োজনীয় জিনিস গোছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোন আমল ফরজ, কোনটি ওয়াজিব
এবং কোনটি সুন্নত—এসব আগে থেকেই জানা থাকলে হজের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
বাংলাদেশের বিশ্বস্ত হজ এজেন্সি হিসেবে, সাইফ হজ্জ ও উমরাহ ট্রাভেলস ২০১৪ সাল থেকে হজ ও ওমরাহযাত্রীদের
সেবা দিয়ে আসছে। আমাদের
হজ লাইসেন্স নং ১১৩৮।
হজের ভিসা, ফ্লাইট বুকিং,
আবাসন, পরিবহন এবং প্রয়োজনীয় শরিয়াহভিত্তিক দিকনির্দেশনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে যাত্রীরা সহায়তা নিতে পারেন।
হজের প্যাকেজ নির্বাচন করার পাশাপাশি হজ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় মাসআলা শেখার দিকেও
সমান গুরুত্ব দিন। কারণ সঠিক সময়ে সঠিক আমল জানা হজের বাস্তব প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত আলাদা করে জানা শুধু একটি তালিকা মুখস্থ করার বিষয় নয়। কোন আমল কোনোভাবেই বাদ দেওয়া
যাবে না, কোথায় ভুল হলে দমের প্রয়োজন হতে পারে এবং কোন আমল অনুসরণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হজের পদ্ধতির আরও
কাছাকাছি থাকা যায়—এই পার্থক্যগুলো জানাই আসল উদ্দেশ্য।
হজের আগে তাই নির্ভরযোগ্যভাবে মাসআলা শিখুন। কোনো বিষয়ে দ্বিধা হলে অনুমান না করে অভিজ্ঞ আলেম বা শরিয়াহ গাইডের
কাছে জেনে নিন। আল্লাহ তাআলা আমাদের হজকে সহিহভাবে আদায় করার এবং মকবুল হজের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত নিয়ে সাধারণ প্রশ্নোত্তর
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত নিয়ে অনেকেরই কিছু মৌলিক প্রশ্ন থাকে—কোন আমলটি অপরিহার্য, কোনটি বাদ পড়লে দম লাগতে
পারে, আর কোনটি সুন্নত। নিচে এসব বিষয়ে সবচেয়ে সাধারণ ও প্রয়োজনীয় প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দেওয়া হলো।
না। শুধু ওমরা পালন করলেই কারও ওপর হজ ফরজ হয়ে যায় না। হজ ফরজ হওয়া নির্ভর করে ইসলামে নির্ধারিত
সামর্থ্য ও অন্যান্য শর্ত পূরণের ওপর। তবে কোনো ব্যক্তির ওপর হজের সব শর্ত পূরণ হয়ে গেলে জীবনে একবার
হজ পালন করা তার জন্য ফরজ।
হানাফি ফিকহে সাধারণভাবে হজ ফরজ হওয়ার কয়েকটি মৌলিক শর্ত উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে মুসলিম
হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেকবান হওয়া, শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকা এবং যাত্রাপথ নিরাপদ হওয়া
গুরুত্বপূর্ণ। শর্তগুলো কীভাবে ভাগ করে গণনা করা হচ্ছে তার ওপর মোট সংখ্যায় কিছু পার্থক্য দেখা যেতে
পারে।
হজের মূল আমল জিলহজ মাসে আদায় করা হয়। বিশেষ করে ৮ জিলহজ থেকে হজের প্রধান কার্যক্রম শুরু
হয় এবং ৯ জিলহজ আরাফাতের দিন, ১০ জিলহজ ইয়াওমুন নাহর এবং ১১–১৩ জিলহজ আইয়্যামে তাশরিকের আমল
সম্পন্ন করা হয়। তবে হজের ইহরাম গ্রহণের নির্ধারিত মাস শুরু হয় শাওয়াল থেকে।
হজের ইতিহাস হজরত ইবরাহিম (আ.), তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) এবং পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর সঙ্গে
গভীরভাবে জড়িত। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) কাবা ঘরের ভিত্তি উঁচু করেন এবং মানুষকে
হজের জন্য আহ্বান জানান। সাফা-মারওয়ার সাঈ, কোরবানি এবং হজের আরও কিছু আমলের সঙ্গে তাঁদের ত্যাগ ও
আনুগত্যের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। পরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজে হজের পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি সাহাবিদের
শিখিয়ে দেন।
না। ফরজের ঘাটতি শুধু দম দিয়ে পূরণ হয় না। যেমন নির্ধারিত সময়ে আরাফাতে অবস্থান হজের মূল রুকন। ফরজ
নিয়ে কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই অভিজ্ঞ আলেম বা শরিয়াহ গাইডের পরামর্শ নিতে হবে।
সাধারণভাবে ওয়াজিব বাদ পড়লে হজ বাতিল হয়ে যায় না। তবে বিনা ওজরে ওয়াজিব ছেড়ে দিলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে
দম প্রয়োজন হতে পারে। কোন আমল বাদ গেছে এবং কী কারণে বাদ গেছে, তার ওপর সঠিক বিধান নির্ভর করবে।
এ বিষয়ে মাযহাবভেদ রয়েছে। অধিকাংশ ফকিহ সাফা-মারওয়ার সাঈকে রুকন হিসেবে দেখেন। ইমাম আবু হানিফা
(রহ.)-এর মতে এটি ওয়াজিব। তাই হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সাঈকে ওয়াজিবের তালিকায় রাখা হয়।
না। মদিনায় মসজিদে নববী ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা জিয়ারত অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। তবে এটি হজের
ফরজ বা ওয়াজিব নয় এবং জিয়ারত করতে না পারলে হজ বাতিল বা অসম্পূর্ণ হয় না।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী মক্কার বাইরের ইফরাদ ও কিরান হজকারীর জন্য তাওয়াফে কুদুম সুন্নত। হজে তামাত্তু
পালনকারী প্রথমে ওমরাহর তাওয়াফ করেন, তাই তার জন্য আলাদা তাওয়াফে কুদুম নেই।
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত জানুন
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত সম্পর্কে সঠিক মাসআলা জেনে আপনার হজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করুন।
Plan early for Hajj 2027. Learn the best time to book your Hajj package from Bangladesh with Saif Hajj Umrah Travels for a safe, smooth journey. Call for early booking.
Book a 40-day shifting Hajj package 2027 from Dhaka, Bangladesh with visa support, flights, Makkah & Madinah hotels, transport, meals, and Ziyarah support.